ইন্টারভিউ রুমের বাইরে কাঁচের ওপারে বসে থাকার অনুভূতিটা নিশ্চয়ই আপনার চেনা। রুমের ভেতরে এসি চলছে, অথচ বাইরে বসে থাকা প্রার্থীর কপাল ঘেমে একাকার, গলা শুকিয়ে কাঠ। সেলস ও মার্কেটিংয়ের ভাইভায় এই ভয়টা একটু বেশিই কাজ করে। কারণ সবাই জানে, এখানে শুধু পরিপাটি রেজাল্ট শিট বা মুখস্থ করা সংজ্ঞায় কাজ হবে না। আপনি যদি একটি সাধারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানেও সেলস এন্ড মার্কেটিং জব ইন্টারভিউ দিতে যান, তবে প্রথম কয়েক মিনিটেই বোর্ড বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করবে—মাঠের তীব্র রোদ, অবিক্রিত পণ্যের চাপ আর মাসের শেষের টার্গেটের বোঝা সামলানোর ক্ষমতা আপনার আছে কি না।
চাকরি পাওয়ার এই যাত্রায় ভয় পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। তবে সঠিক প্রস্তুতি আর মাঠের বাস্তবতাকে বুঝতে পারলে এই ইন্টারভিউ রুমটাই আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। বইয়ের পাতা থেকে বের হয়ে আসুন; আজ আমরা কথা বলব একজন সিনিয়র সহকর্মীর মতো, যিনি নিজে মাঠে জুতো ক্ষয় করেছেন এবং ভাইভা বোর্ডের টেবিলের উভয় পাশেই বসেছেন।
এক নজরে দেখুন ⭐⭐⭐⭐⭐
- ১. সেলস বনাম মার্কেটিং: ভাইভা বোর্ডে ধারণার স্বচ্ছতা যেভাবে যাচাই করা হয়
- ২. সেলস এন্ড মার্কেটিং জব ইন্টারভিউ বোর্ডে সফল হওয়ার গ্রুমিং ও মানসিক প্রস্তুতি
- ৩. ফিল্ড সেলসের টেকনিক্যাল টার্মিনোলজি: ইন্টারভিউয়ারের মন জয়ের গোপন চাবিকাঠি
- ৪. খাতভিত্তিক ইন্টারভিউয়ের তফাত: এফএমসিজি রিটেইল বনাম করপোরেট বিটুবি সেলস
- FMCG ও ফিল্ড রিটেইল সেলস
- B2B বা করপোরেট সলিউশন সেলস
- ৫. ভাইভা বোর্ডের ট্রিকি প্রশ্ন ও বাস্তবসম্মত উত্তর দেওয়ার কৌশল
- “আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?”
- “মাসের ২০ তারিখ পার হয়ে গেল, কিন্তু টার্গেটের অর্ধেকও পূরণ হয়নি। আপনি কী করবেন?”
- “আপনাকে প্রত্যন্ত মফস্বলে পোস্টিং দিলে চাকরি করবেন তো?”
- ৬. লাইভ রোল-প্লে: “আমাকে এই কলমটি বেচে দেখান” ও অন্যান্য অবজেকশন
- দামের আপত্তি সামলানোর সহজ কৌশল
- ৭. প্রথম ৯০ দিনের একটি বাস্তবসম্মত অ্যাকশন প্ল্যান (30-60-90 Day Plan)
- ৮. স্যালারি নেগোসিয়েশন ও ইন্টারভিউ শেষে কিছু স্মার্ট প্রশ্ন
১. সেলস বনাম মার্কেটিং: ভাইভা বোর্ডে ধারণার স্বচ্ছতা যেভাবে যাচাই করা হয়
বোর্ডে ঢুকে বসার পর ইন্টারভিউয়াররা খুব সহজ একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে পারেন: “সেলস আর মার্কেটিংয়ের তফাতটা আপনার ভাষায় বলুন তো?” বেশিরভাগ প্রার্থী এই জায়গায় এসে বইয়ের ইংরেজি সংজ্ঞা আওড়াতে শুরু করেন। ইন্টারভিউয়াররা কিন্তু বইয়ের সংজ্ঞা শুনতে চান না; তারা দেখতে চান বিজনেসের মূল চাকাটা আপনি বোঝেন কি না।
মার্কেটিং মূলত বাজারে একটি ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে এবং সম্ভাব্য ক্রেতার আগ্রহ জাগায়। আর সেলস সরাসরি সেই আগ্রহকে নগদে রূপান্তর করে কোম্পানির ঘরে রেভিনিউ নিয়ে আসে।
একটি সহজ দেশি উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রাণ বা আকিজ যখন টিভিতে কিংবা ফেসবুকে তাদের নতুন জুসের চমৎকার বিজ্ঞাপন চালায়, বিলবোর্ড বসায়—তা হলো মার্কেটিং। তারা আপনার মনে ইচ্ছা তৈরি করল। এরপর আপনি যখন গরমে ঘেমে স্থানীয় মুদি দোকানে গিয়ে নির্দিষ্ট ওই জুসটি চেয়ে কিনলেন এবং দোকানদার আপনাকে তা বুঝিয়ে দিল, সেটি হলো সেলসের সার্থকতা।
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | মার্কেটিং (Marketing) | সেলস (Sales) |
| মূল ফোকাস | ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের টান ও দীর্ঘমেয়াদী আগ্রহ তৈরি | তাৎক্ষণিক পণ্য বিক্রয় ও নগদ ক্যাশ কালেকশন |
| কাজের ধরন | বাজার গবেষণা, ক্যাম্পেইন, সোশ্যাল মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন | সরাসরি ক্লায়েন্ট ভিজিট, রিলেশন তৈরি ও ডিল ক্লোজ |
| ফলাফলের হিসাব | কতজন মানুষ পণ্যটি সম্পর্কে জানল (Reach, Leads) | দিনশেষে মোট কত টাকার পণ্য বিক্রি হলো (Revenue) |
| কমিউনিকেশন | একসাথে পুরো টার্গেট অডিয়েন্সের সাথে কথা বলা | প্রতিটি কাস্টমারের সাথে ওয়ান-টু-ওয়ান বসে বোঝানো |
ফিলিপ কটলারের আধুনিক বিপণন তত্ত্ব অনুযায়ী, শক্তিশালী মার্কেটিং একটি পণ্যকে ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে, কিন্তু সেই পণ্যটি ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব সেলস টিমের। এই দুটি বিভাগ একটি গাড়ির দুটি চাকার মতো—একটির গতি কমলে অন্যটি এগোতে পারে না।
২. সেলস এন্ড মার্কেটিং জব ইন্টারভিউ বোর্ডে সফল হওয়ার গ্রুমিং ও মানসিক প্রস্তুতি
সেলসের মানুষ মানেই একটি জীবন্ত ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। আপনি কেমন পোশাকে যাচ্ছেন এবং কীভাবে কথা বলছেন, তা থেকে নিয়োগকর্তা বোঝার চেষ্টা করেন আপনি তাদের পণ্যের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন কি না।
প্রথমেই আসে গ্রুমিং। ছেলেদের ক্ষেত্রে পরিপাটি করে আয়রন করা হালকা রঙের ফুলহাতা শার্ট এবং ডার্ক ফর্মাল প্যান্ট পরা ভালো। জুতো অবশ্যই পরিষ্কার ও পলিশ করা হতে হবে। অতিরিক্ত কড়া সুবাস বা পারফিউম এড়িয়ে চলুন। মেয়েদের ক্ষেত্রে শালীন ও মার্জিত ফর্মাল পোশাক নির্বাচন করা উচিত। সাজসজ্জা যেন খুব বেশি জমকালো না হয়, বরং প্রফেশনাল ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়।
মানসিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি—নার্ভাস হওয়া কোনো অপরাধ নয়। ভাইভা রুমে ঢোকার সময় বুক ধড়ফড় করলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক সেকেন্ড গভীর নিঃশ্বাস নিন। মুখে একটি সহজ ও অমায়িক হাসি রেখে রুমে ঢুকুন। ইন্টারভিউয়ারদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। চোখের দিকে তাকাতে খুব বেশি অস্বস্তি হলে তাদের দুই ভ্রুর মাঝখানের অংশে চোখ রাখুন; উল্টোদিকের মানুষটি ভাববেন আপনি তার দিকেই তাকিয়ে আছেন।
৩. ফিল্ড সেলসের টেকনিক্যাল টার্মিনোলজি: ইন্টারভিউয়ারের মন জয়ের গোপন চাবিকাঠি
বিশেষ করে কনজিউমার গুডস (FMCG), ফার্মাসিউটিক্যালস বা রিটেইল ডিস্ট্রিবিউশনে যখন আপনি ভাইভা দিতে যাবেন, তখন কিছু টেকনিক্যাল শব্দ আপনার জানা আছে কি না তা যাচাই করা হবে। এই শব্দগুলো আপনি যদি নিজ থেকে উত্তরে ব্যবহার করতে পারেন, তবে বোর্ড একবাক্যে বুঝে নেবে আপনি মাঠের মানুষ।
- Primary Sales বনাম Secondary Sales: কোম্পানি বা ফ্যাক্টরি থেকে পণ্য যখন সরাসরি ডিলারের গুদামে পৌঁছায় এবং কোম্পানি তার বিল পায়, তাকে প্রাইমারি সেলস বলে। এরপর ডিলার যখন সেই মালামাল বিভিন্ন এলাকার পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে দোকানে পৌঁছায়, তাকে সেকেন্ডারি সেলস বলে। অনেক সেলস অফিসার প্রাইমারি সেলস দেখিয়ে বসে থাকেন, অথচ সেকেন্ডারি সেলস না হলে ডিলারের কাছে আগের স্টক জমে থাকে এবং পরবর্তী মাসে আর নতুন অর্ডার আসে না।
- Strike Rate (স্ট্রাইক রেট): সারাদিনে আপনি মোট কতগুলো দোকানে ঢুকলেন এবং কতগুলো দোকান থেকে নগদ অর্ডার কাটতে পারলেন, তার অনুপাতই হলো স্ট্রাইক রেট। আপনি যদি দিনে ৫০টি রিটেইল আউটলেট ভিজিট করে ৩৫টিতে মেমো কাটতে পারেন, তবে আপনার স্ট্রাইক রেট ৭০%।
- Memo Size বা Drop Size: একটি সিঙ্গেল ভাউচারে বা চালানে আপনি গড়ে কত টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। একজন সাধারণ সেলসম্যান হয়তো শুধু চিপস বা বিস্কুটের অর্ডার নিয়ে চলে আসেন, কিন্তু একজন চৌকস কর্মী ওই দোকানের সেলফ দেখেই তাকে বাড়তি নতুন আইটেম নেওয়ার জন্য রাজি করান।
- Outlet Coverage: একটি নির্দিষ্ট বাজারে মোট কতগুলো সম্ভাব্য দোকান আছে এবং তার কত শতাংশে আপনার কোম্পানির পণ্য নিয়মিত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, এটিই হলো আউটলেট কভারেজ।
- Credit (বাকি) ও রিকভারি ম্যানেজমেন্ট: বাংলাদেশের বাজারে সেলসের সবচেয়ে বড় প্যারা হলো বাকির টাকা তোলা। ভাইভা বোর্ডে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, “দোকানদার যদি বাকি ছাড়া মাল না নেয়, আপনি কী করবেন?” পরিষ্কার ভাষায় বলবেন, আপনি বাকিতে বিক্রির চেয়ে দ্রুত পণ্য মুভমেন্টে বিশ্বাসী। যেসব দোকানে নিয়মিত বিক্রি আছে, সেখানে স্বল্প মেয়াদে লিমিটেড ক্রেডিট দেওয়া যায়, তবে বাকি তোলার ক্ষেত্রে কখনো আপস করা যাবে না।
৪. খাতভিত্তিক ইন্টারভিউয়ের তফাত: এফএমসিজি রিটেইল বনাম করপোরেট বিটুবি সেলস
আপনি কোন খাতে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে প্রশ্নের মেজাজ বদলে যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রধান দুটি খাতকে এভাবে ভাগ করা যায়:
FMCG ও ফিল্ড রিটেইল সেলস
এখানে কর্পোরেট স্যুটের চেয়ে আপনার হাঁটার গতি আর মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা বেশি জরুরি। বোর্ড আপনার কাছে জানতে চাইবে:
- “টানা রোদের মধ্যে দিনে ৪০টা দোকান ভিজিট করে ডিলারের সাথে বসে হিসাব মেলাতে পারবেন তো?”
- “দোকানদার যদি আপনার আগের কোম্পানির মালামাল নষ্ট হওয়ার অভিযোগ তোলে, কীভাবে মেটাবেন?”
এখানে আপনার উত্তর হওয়া উচিত সমস্যা সমাধানের দিকে। দোকানদারের ক্ষোভ শান্তভাবে শুনুন, ড্যামেজ পলিসি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিন এবং তার আস্থা ফিরিয়ে আনতে ছোট অর্ডার দিয়ে নতুন করে শুরু করার কথা বলুন।
B2B বা করপোরেট সলিউশন সেলস
এখানে কাস্টমার হলেন কোনো ব্যাংকের হেড অব আইটি, কোনো কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার বা কোনো করপোরেট সিইও। এখানে রাস্তাঘাটে দৌড়াদৌড়ির চেয়ে প্রফেশনাল প্রেজেন্টেশন ও ইমেইল ফলো-আপ বেশি কাজে লাগে। প্রশ্ন হতে পারে:
- “আমাদের তিন লাখ টাকার সফটওয়্যার একটি বড় প্রতিষ্ঠানে পিচ করতে আপনাকে পাঠানো হলে ডিসিশন মেকারের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবেন?”
- “একটি বড় ডিল ক্লোজ হতে যদি ৩ মাস সময় লাগে, এই পুরো সময় ক্লায়েন্টকে কীভাবে পাইপলাইনে ধরে রাখবেন?”
এখানে আপনার উত্তর সাজাতে হবে রিসার্চের ওপর ভিত্তি করে। ক্লায়েন্টের বর্তমান ব্যবসার পেইন পয়েন্ট কোথায়, আমাদের সমাধান কীভাবে তাদের খরচ বাঁচাবে বা কাজের গতি বাড়াবে—তা প্রপোজালের মাধ্যমে বুঝিয়ে নিয়মিত ফলো-আপ করার কথা বলবেন।
৫. ভাইভা বোর্ডের ট্রিকি প্রশ্ন ও বাস্তবসম্মত উত্তর দেওয়ার কৌশল
ইন্টারভিউ বোর্ডে কিছু প্রশ্ন থাকে যা আপনার উত্তর শোনার চেয়ে আপনার প্রতিক্রিয়ার ধরন বোঝার জন্য করা হয়। এমন কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন কীভাবে শান্তভাবে সামলাবেন, তা জেনে নেওয়া ভালো।
“আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?”
বইয়ের মতো করে ভুলেও বলবেন না, “আমার কোনো দুর্বলতা নেই” কিংবা “আমি কাজ ছাড়া কিছু বুঝি না।” এটা শুনলেই বোর্ডের অভিজ্ঞ মানুষেরা ধরে ফেলেন আপনি বানিয়ে বলছেন।
বাস্তবসম্মতভাবে এভাবে বলুন: “শুরুর দিকে আমি কোনো কাস্টমারকে সরাসরি ‘না’ বলতে পারতাম না। ফলে অনেক সময় অযৌক্তিক শর্ত মেনে নিয়ে নিজের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ বাড়িয়ে ফেলতাম। তবে এখন আমি পেশাদারিত্বের সাথে মিষ্টি ভাষায় যুক্তি দিয়ে কাস্টমারকে কোম্পানির নিয়মের ভেতর রাখতে শিখেছি।”
“মাসের ২০ তারিখ পার হয়ে গেল, কিন্তু টার্গেটের অর্ধেকও পূরণ হয়নি। আপনি কী করবেন?”
অনেকে এ ধরনের প্রশ্নে প্যানিকড হয়ে যান। কোনোভাবেই সহকর্মী বা বাজারের মন্দার ওপর দোষ চাপাবেন না।
ধীরস্থিরভাবে বলুন: “প্রথমে আমি আমার কাস্টমারদের ফানেলটা রিভিউ করব। কোন কোন ক্লায়েন্টের সাথে ডিল আটকে আছে এবং কেন আটকে আছে, তা বের করব। আমার যে নিয়মিত ও বিশ্বস্ত ক্লায়েন্টরা আছেন, তাদের কাছে গিয়ে বিশেষ অফার বা জরুরি প্রয়োজনে বাড়তি স্টক নেওয়ার অনুরোধ জানাব। পাশাপাশি সিনিয়রদের সাথে বসে স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন করব এবং বাকি ১০ দিন প্রতিদিনের ভিজিট সংখ্যা বাড়িয়ে দেব।”
“আপনাকে প্রত্যন্ত মফস্বলে পোস্টিং দিলে চাকরি করবেন তো?”
বাংলাদেশে বহুজাতিক বা বড় লোকাল গ্রুপগুলোতে ক্যারিয়ার গড়তে হলে ঢাকার বাইরের অভিজ্ঞতা অমূল্য।
আপনি বলবেন: “আমি একে একটি দারুণ সুযোগ হিসেবে দেখি। মফস্বল বা জেলা শহরের বাজারে কাজ করলেই রিটেইল ডিস্ট্রিবিউশন এবং তৃণমূলের ক্রেতাদের মনস্তত্ত্ব সবচেয়ে ভালো শেখা যায়। যেখানে কোম্পানির ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ বেশি, আমি সেখানেই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।”
৬. লাইভ রোল-প্লে: “আমাকে এই কলমটি বেচে দেখান” ও অন্যান্য অবজেকশন
ইন্টারভিউয়ার যদি হঠাৎ তার পকেট থেকে একটি সাধারণ বলপেন বের করে টেবিলের ওপর রাখেন এবং বলেন, “এই কলমটা আমাকে বিক্রি করে দেখান”—তখন বেশিরভাগ প্রার্থীই হোঁচট খান। হলিউডের সিনেমার মতো ডায়ালগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মূল নীতি হলো: আগে সমস্যা খুঁজে বের করুন, তারপর সমাধান হিসেবে পণ্য দিন।
- ইন্টারভিউয়ার: “এই কলমটি আমাকে বিক্রি করুন।”
- আপনি: “স্যার, আমি কি আপনাকে একটি সাধারণ প্রশ্ন করতে পারি?”
- ইন্টারভিউয়ার: “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।”
- আপনি: “ধন্যবাদ স্যার। আপনি প্রতিদিন এতগুলো ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, নিশ্চয়ই প্রার্থীদের নানা পয়েন্ট নোট করতে হয় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অফার লেটারে সাইন করতে হয়। এই কাজের জন্য আপনার হাতে এখন যে কলমটি আছে, সেটি কি লেখার সময় পুরোপুরি স্মুথ সাপোর্ট দিচ্ছে?”
- ইন্টারভিউয়ার: “হুম, আমার কলমটি দিয়ে কাজ চলে যায়। নতুন কলম দরকার নেই।”
- আপনি: “আমি বুঝতে পারছি স্যার। তবে অনেক সময় মিটিং বা জরুরি স্বাক্ষরের মাঝপথে সাধারণ বলপেনের কালি আটকে গেলে বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই কলমটিতে রয়েছে কুইক-ড্রাই জেল প্রযুক্তি, যা ভিজে যাওয়া বা আঙুলে কালি লাগার ঝুঁকি ছাড়াই টানা মসৃণ ফ্লো নিশ্চিত করে। আপনি কি আগামীকালের মিটিংগুলোর জন্য এই ব্যাকআপ কলমটি ডেস্কে রাখতে চান?”
এভাবে কথা বললে ইন্টারভিউয়ার বুঝতে পারবেন আপনি সরাসরি পণ্যের গুণগান না গেয়ে আগে তার প্রয়োজনীয়তা বা সম্ভাব্য সমস্যার ওপর আলোকপাত করেছেন।
দামের আপত্তি সামলানোর সহজ কৌশল
কাস্টমার যখন বলে, “আপনার পণ্যের দাম বাজারের অন্য ব্র্যান্ডের চেয়ে অনেক বেশি”, তখন ঘাবড়ে গিয়ে দাম কমানোর কথা বলবেন না।
শান্তভাবে বলুন: “আপনার পয়েন্টটি একদম যৌক্তিক স্যার। দামের দিক দিয়ে আমরা হয়তো বাজারে সবচেয়ে সস্তা নই। কিন্তু আপনি যদি পণ্যের স্থায়ী মান ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার বিবেচনা করেন, তবে দেখবেন এটি সাধারণ পণ্যের চেয়ে দ্বিগুণ সময় চলে। সাময়িকভাবে কম দামি পণ্য কিনে ঘন ঘন নষ্ট হওয়ার চেয়ে, একটু ভালো পণ্য নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকাটাই দীর্ঘমেয়াদে আপনার বাড়তি টাকা বাঁচিয়ে দেবে।”
৭. প্রথম ৯০ দিনের একটি বাস্তবসম্মত অ্যাকশন প্ল্যান (30-60-90 Day Plan)
ভাইভা শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে আপনি যদি নিজে থেকেই আপনার প্রথম তিন মাসের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ইন্টারভিউয়ারদের সামনে তুলে ধরেন, তবে তাদের মনে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে যাবে।
- প্রথম ৩০ দিন (শেখা ও সম্পর্ক গড়া): কোম্পানির প্রতিটি পণ্যের খুঁটিনাটি বোঝা, সিনিয়রদের সাথে ফিল্ডে গিয়ে বাজারের চলন দেখা এবং বরাদ্দকৃত এলাকার ডিলার ও শীর্ষ রিটেইলারদের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় তৈরি করা।
- পরবর্তী ৩০ দিন (পাইপলাইন মজবুত করা): নিজের স্ট্রাইক রেট বাড়ানো, যেসব দোকানে আমাদের পণ্য আগে যেত না সেখানে স্যাম্পল দিয়ে সম্পর্ক শুরু করা এবং নিয়মিত ফলো-আপ চালু রাখা।
- শেষ ৩০ দিন (টার্গেট অর্জন ও স্বনির্ভরতা): সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের মাসিক টার্গেট পূরণ করা, বাকি টাকা সঠিক সময়ে তুলে আনা এবং এলাকার সেলস গ্রোথ নিয়ে ম্যানেজমেন্টের কাছে একটি রিপোর্ট পেশ করা।
৮. স্যালারি নেগোসিয়েশন ও ইন্টারভিউ শেষে কিছু স্মার্ট প্রশ্ন
সেলসের চাকরিতে বেতন নিয়ে কথা বলার সময় সতর্ক থাকতে হবে। এখানে বেসিক বেতন বা ফিক্সড স্যালারি কত এবং বিক্রির ওপর ইনসেন্টিভ বা কমিশন কত—তা পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
অনেক কোম্পানি অতিরিক্ত ইনসেন্টিভের লোভ দেখিয়ে ফিক্সড বেতন খুব কম রাখতে চায়। বাজারে নতুন হলে আপনি চেষ্টা করবেন ফিক্সড অংশ যেন অন্তত ৭০% থাকে, যাতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়। যদি তারা কোনো সেলস টার্গেট বেঁধে দেয়, তবে বিনয়ের সাথে জেনে নিন তাদের বর্তমান টিমের কর্মীরা সেই টার্গেট নিয়মিত অর্জন করতে পারছেন কি না।
ইন্টারভিউয়ের শেষভাগে আপনাকে যখন জিজ্ঞেস করা হবে, “আমাদের কাছে আপনার কি কোনো জানার আছে?”, তখন ভুলেও বলবেন না, “না স্যার, কিছু নেই।”
বরং আপনি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন নিয়ে এমন প্রশ্ন করতে পারেন যা প্রমাণ করে আপনি লম্বা রেসের ঘোড়া:
- “স্যার, আপনাদের বর্তমান সেলস টিমে যিনি এই মুহূর্তে সেরা পারফর্মার, তার কোন বিশেষ অভ্যাস বা কাজের ধরন তাকে সবার চেয়ে এগিয়ে রেখেছে?”
- “আগামী এক বছরে আপনাদের কোম্পানি নতুন কোনো প্রোডাক্ট ক্যাটাগরি বা নতুন বাজারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে কি না?”
সেলসের জগতে প্রতিটি ব্যর্থ ইন্টারভিউ এক একটি নতুন ফিল্ড ট্রায়াল। মাঠের মানুষের প্রধান শক্তি হলো তার ইতিবাচক মনোভাব। মুখের হাসি ধরে রেখে, মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনি যদি সততা ও পরিশ্রমের সাথে নিজের উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে পারেন, তবে যেকোনো কর্পোরেট ভাইভা বোর্ডে আপনি শুধু উত্তীর্ণই হবেন না, নিজের যোগ্য সম্মান নিয়ে বের হয়ে আসবেন।


